আদালতের রায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
আদালতের রায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

৫ নভে, ২০২৬

মানিকগঞ্জের ট্রিপল মার্ডার: ৫ জনের মৃত্যুদণ্ড, ৮ জনের যাবজ্জীবন

মানিকগঞ্জের ট্রিপল মার্ডার: ৫ জনের মৃত্যুদণ্ড, ৮ জনের যাবজ্জীবন

ছবি: সংগৃহীত 
মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় জমিজমা ও সম্পত্তির বিরোধের জেরে তিনজনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা আলোচিত ট্রিপল মার্ডার মামলায় পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই মামলায় আটজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আরও সাত আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড এবং চারজনকে খালাস দিয়েছেন আদালত।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে মানিকগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক এস কে এম তোফায়েল হাসান এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আ ফ ম নুরতাজ আলম বাহার।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি যারা

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ আসামি হলেন—সিংগাইর উপজেলার গোবিন্দল এলাকার জহির উদ্দিনের ছেলে মো. জিয়ার উদ্দিন, সামসুল হকের ছেলে মো. জাহিদুল ইসলাম, আ. রশিদ, জসিম এবং আলী মিয়ার ছেলে সিদ্দিক মিয়া।

দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় তাঁদের মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে আরও চার মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আট আসামি হলেন—মো. জহির উদ্দিন, আজিজুল, উজ্জল, মো. সামসুল হক, সালাউদ্দিন, মাজেদ মিয়া, মো. মরণ ও স্বপন। তাঁদের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

অন্য আসামিদের সাজা ও খালাস

মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে শামীম ও হাবু মিয়াকে দণ্ডবিধির ৩২৬/৩৪ ধারায় পাঁচ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে তাঁদের আরও দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

এ ছাড়া মজনু মিয়াকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, রাজিয়া খাতুন ও সুফিয়া খাতুনকে ছয় মাস করে এবং সাহেরা ও খাতুনীকে তিন মাস করে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

অন্যদিকে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় নুরু মিয়ার ছেলে উজ্জ্বল, সওদাগরের ছেলে ওলী আহাদ, চানদের ছেলে শুকুর জোলা ও রাজা জোলাকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

সম্পত্তির বিরোধ থেকে হত্যাকাণ্ড

মামলার নথি ও অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, হাসিনা নামের এক নারী বাহরাইনে বসবাস করতেন। তাঁর স্বামী ও সন্তান না থাকায় মৃত্যুর পর রেখে যাওয়া সম্পত্তি ও অর্থের মালিকানা নিয়ে ভাই-বোনদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, হাসিনার বোন রাজিয়া খাতুন, তাঁর স্বামী ও ছেলেরা ওই সম্পত্তি ও অর্থ ভোগদখল করছিলেন। এ নিয়ে একাধিকবার স্থানীয়ভাবে সালিশ বৈঠক হলেও বিরোধের কোনো সমাধান হয়নি।

২০১৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টায় বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সালিশ বৈঠকের দিন নির্ধারিত ছিল। কিন্তু ওই দিন সকাল পৌনে ৮টার দিকে জসিম তাঁর মামা টেঁন্ডুল মোল্লা, করিম মোল্লা ও আজিজ মোল্লাকে শামসুল হকের বাড়িতে ডেকে নেন।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, তাঁরা সেখানে পৌঁছালে রাজিয়া খাতুনের নির্দেশে জসিমসহ অন্য আসামিরা রামদা, সড়কি, লোহার রড ও বাঁশের লাঠি নিয়ে তাঁদের ওপর হামলা চালান। হামলায় তিনজনই গুরুতর আহত হন। পরে আজিজ মোল্লা, টেঁন্ডুল মোল্লা ও করিম মোল্লার মৃত্যু হয়।

মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া

ঘটনার পর ২০১৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি সিংগাইর থানায় হত্যা মামলা করেন মো. ফরিদা আক্তার। তদন্ত শেষে ২০১৭ সালের ২৮ এপ্রিল সিংগাইর থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম ২৪ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় মামলায় ২১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। সাক্ষ্য-প্রমাণ ও শুনানি শেষে বৃহস্পতিবার আদালত এ রায় ঘোষণা করেন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও পাবলিক প্রসিকিউটর আ ফ ম নুরতাজ আলম বাহার জানান, জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে ২০১৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তিনজনকে হত্যার ঘটনা ঘটে। ২১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে আদালত আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছেন। ঘোষিত এ রায়ে রাষ্ট্রপক্ষ ও বাদীপক্ষ সন্তুষ্ট বলে জানান তিনি।

সূত্র: যুগান্তর

বসতভিটার জমি বিক্রির বায়নানামা যথাযথভাবে প্রমাণিত না হলে সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়নের ডিক্রি নয়: হাইকোর্টের রায়

বসতভিটার জমি বিক্রির বায়নানামা যথাযথভাবে প্রমাণিত না হলে সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়নের ডিক্রি নয়: হাইকোর্টের রায়

ছবি: সংগৃহীত 
বসতভিটার জমি বিক্রির বায়নানামা (Bainapatra) যথাযথভাবে প্রমাণিত না হলে এবং চুক্তির পক্ষদের আইনগত সক্ষমতা ও চুক্তির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়নের (Specific Performance of Contract) ডিক্রি দেওয়া যায় না। বিশেষ করে চুক্তির মাধ্যমে বিবাদীকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলা হলে, যাতে তাঁকে নিজের বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ হওয়ার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়, সে ক্ষেত্রে আদালত সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়নের প্রতিকার দিতে বাধ্য নয়।

এক জমি বিক্রির বায়নানামা সংক্রান্ত মামলায় নিম্ন আদালতের দেওয়া সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়নের ডিক্রি বাতিল করে এমন পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

বিচারপতি আবদুর রহমানের একক বেঞ্চ গত ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে মোছা. আম্বিয়া খাতুন বনাম মোছা. হালিমা বেগম ও অন্যান্য (সিভিল রিভিশন নং- ৩৪০৭/২০২৪) এ রায় দেন। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ৫ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে।

মামলার পটভূমি

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, বিবাদী আম্বিয়া খাতুন ১৯৮১ ও ১৯৮২ সালে দুটি কবলা দলিলের মাধ্যমে বিরোধপূর্ণ জমি ক্রয় করেন। সেখানে তিনি বসতঘর নির্মাণ করে পরিবারসহ বসবাস করতেন। ১৯৯০ সালে মেয়ের বিয়ের খরচের জন্য অর্থের প্রয়োজন হলে তিনি জমিটি বিক্রির প্রস্তাব দেন বলে দাবি করেন বাদীপক্ষ।

বাদীদের দাবি, জমির মূল্য ৩ লাখ টাকা নির্ধারণ করে ১৯৯০ সালের ১৪ অক্টোবর একটি বায়নানামা সম্পাদিত হয়। এর মধ্যে ২ লাখ টাকা অগ্রিম দেওয়া হয় এবং বাকি ১ লাখ টাকা তিন মাসের মধ্যে পরিশোধের শর্ত ছিল। অবশিষ্ট টাকা গ্রহণের পরও বিবাদী জমির দলিল সম্পাদন ও নিবন্ধন করে না দেওয়ায় তাঁরা আদালতে সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়নের মামলা করেন।

অন্যদিকে, বিবাদী আম্বিয়া খাতুনের দাবি ছিল, মেয়ের বিয়ের জন্য তিনি বাদীদের কাছ থেকে মাত্র ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। ঋণের নিরাপত্তা হিসেবে কয়েকটি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর ও জমির মূল দলিল তাঁদের কাছে জমা দেন। কিন্তু বাদীপক্ষ সেই স্ট্যাম্প ব্যবহার করে মিথ্যা বায়নানামা তৈরি করে জমি আত্মসাতের চেষ্টা করে। তিনি আরও দাবি করেন, জমিটি তাঁর পরিবারের বসতভিটা এবং এর বাইরে অন্য কোনো জমি নেই বলে নয়, বরং ওই জমিতেই পরিবার নিয়ে তাঁর বসবাস।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণে বলেন, বায়নানামায় চুক্তি সম্পাদনের জন্য তিন মাস সময় নির্ধারিত ছিল। অথচ ১৯৯০ সালের ১৪ অক্টোবর চুক্তি সম্পাদনের দাবি করা হলেও বাদীপক্ষ ১৯৯১ সালের ৩ ডিসেম্বর আইনজীবীর মাধ্যমে নোটিশ পাঠায় এবং ১৯৯৩ সালের ১ আগস্ট মামলা দায়ের করে। অর্থাৎ চুক্তিতে নির্ধারিত তিন মাসের মধ্যে কোনো আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিম্ন আদালত যথাযথভাবে বিবেচনা করেনি।

আদালত আরও বলেন, বাদীপক্ষের বায়নানামায় তিনজন অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে চুক্তির পক্ষ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু তাঁদের পক্ষে কোনো আইনগত অভিভাবক চুক্তি সম্পাদন করেননি। চুক্তি আইন, ১৮৭২-এর ১১ ধারা অনুযায়ী, চুক্তি সম্পাদনের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সাবালক ও আইনগতভাবে চুক্তিতে সক্ষম হতে হবে। ফলে চুক্তিটির বৈধতা ও আইনগত প্রয়োগযোগ্যতা যাচাই করা প্রয়োজন ছিল।

আদালতের মতে, সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়নের মামলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত—চুক্তিটি আইনগতভাবে বৈধ ও কার্যকরযোগ্য কি না। কিন্তু বিচারিক আদালত যথাযথভাবে এ বিষয়ে ইস্যু গঠন করেনি। দেওয়ানি মামলায় পক্ষগুলোর আরজি ও লিখিত জবাবের ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট ইস্যু গঠন ন্যায়সংগত বিচার নিশ্চিত করার মৌলিক শর্ত। কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিরোধীয় বিষয় ইস্যুতে অন্তর্ভুক্ত না হলে তার যথাযথ বিচার ব্যাহত হতে পারে।

আদালত আরও লক্ষ্য করেন, বায়নানামার জমিটি ছিল বিবাদীর বসতভিটা, যেখানে তিনি সন্তানদের নিয়ে বসবাস করতেন। বাদীপক্ষের সাক্ষীও জেরায় বিষয়টি স্বীকার করেছেন। অথচ বিবাদীর অন্য জমি ও দোকান থাকার বিষয়ে বাদীপক্ষের দাবি থাকলেও তার পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।

এ ছাড়া বায়নানামার খসড়া প্রস্তুত, সাক্ষীদের সাক্ষ্য, দলিল সম্পাদনের পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি ছিল। চুক্তির কথিত ছয়জন সাক্ষীর কাউকেই বাদীপক্ষ সাক্ষ্য দিতে আদালতে হাজির করেনি। নোটারি পাবলিককেও পরীক্ষা করা হয়নি। এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিম্ন আদালত বিবেচনায় নেয়নি।

সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়ন আদালতের বিবেচনাধীন প্রতিকার

সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ এর ২২ ধারা উল্লেখ করে হাইকোর্ট বলেন, সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়নের ডিক্রি দেওয়া আদালতের বিবেচনাধীন বিষয়। কোনো চুক্তি বৈধভাবে প্রমাণিত হলেও শুধু সে কারণে আদালত সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়নের প্রতিকার দিতে বাধ্য নয়।

বিশেষ করে চুক্তি বাস্তবায়নের ফলে বিবাদী এমন কোনো অপ্রত্যাশিত ভোগান্তি বা ক্ষতির সম্মুখীন হলে, যা চুক্তি বাস্তবায়ন না করলে বাদীর ক্ষেত্রে সৃষ্টি হতো না, সে ক্ষেত্রে আদালত সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়নের ডিক্রি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আদালতকে ন্যায়বিচার, ন্যায়সংগততা এবং পক্ষগুলোর বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হবে।

হাইকোর্ট আরও বলেন, নিম্ন আদালতগুলো বাদীপক্ষের সাক্ষ্যকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিবাদীপক্ষের সাক্ষ্য ও গুরুত্বপূর্ণ দলিল যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেনি। আপিল আদালতও নিজস্বভাবে সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ না করে বিচারিক আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে। ফলে সাক্ষ্যপ্রমাণের ভুল পাঠ, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বিবেচনায় না নেওয়া এবং যথাযথ ইস্যু গঠন না করার কারণে ন্যায়বিচার ব্যাহত হয়েছে।

রিভিশনে নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত বাতিল

হাইকোর্ট বলেন, দেওয়ানি কার্যবিধির ১১৫(১) ধারায় রিভিশন আদালত সাধারণত আপিল আদালতের মতো নতুন করে সাক্ষ্য-প্রমাণ মূল্যায়ন করে না। তবে নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্তে এখতিয়ারগত ত্রুটি, গুরুত্বপূর্ণ আইনগত অবৈধতা, সাক্ষ্যপ্রমাণের ভুল পাঠ কিংবা ন্যায়বিচার ব্যাহত হওয়ার মতো গুরুতর ত্রুটি থাকলে হস্তক্ষেপ করা যায়।

এসব বিবেচনায় হাইকোর্ট রুল অ্যাবসলিউট ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে চট্টগ্রামের যুগ্ম জেলা জজ দ্বিতীয় আদালতের ১৯৯৩ সালের ৭৬ নম্বর অপর শ্রেণির মামলায় দেওয়া ডিক্রি এবং অতিরিক্ত জেলা জজ প্রথম আদালতের ২৭২/২০০৫ নম্বর আপিল মামলায় দেওয়া রায় ও ডিক্রি বাতিল করেন। ফলে বাদীদের দায়ের করা মূল সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়নের মামলাটি খারিজ হয়ে যায়।

তবে বিবাদী আম্বিয়া খাতুন ৫০ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণের বিষয়টি স্বীকার করায় আদালত তাঁকে ওই টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেন। রায়ের অনুলিপি বিচারিক আদালতে পৌঁছানোর ৬০ দিনের মধ্যে ১৯৯০ সালের ১৪ অক্টোবর থেকে টাকা জমা দেওয়া পর্যন্ত বার্ষিক নয়, বরং মাসিক ৮ শতাংশ সরল সুদসহ ৫০ হাজার টাকা বাদীপক্ষকে পরিশোধ করতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হলে আইন অনুযায়ী ডিক্রির মাধ্যমে তা আদায় করা যাবে এবং সে ক্ষেত্রে টাকা আদায় না হওয়া পর্যন্ত চক্রবৃদ্ধি সুদ দিতে হবে।

মামলাটিতে উভয় পক্ষের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন। রায়ে কোনো খরচের আদেশ দেওয়া হয়নি।

বিডি ল' পোস্ট/মাসুম

স্ত্রীর ছবি ফেসবুকে প্রকাশের জেরে বন্ধুকে হত্যা, কুয়েতে বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড

স্ত্রীর ছবি ফেসবুকে প্রকাশের জেরে বন্ধুকে হত্যা, কুয়েতে বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড

ছবি: সংগৃহীত 
স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশের ঘটনায় বন্ধুকে হত্যার দায়ে কুয়েতে এক বাংলাদেশি প্রবাসীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন দেশটির ফৌজদারি আদালত। পূর্বপরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হওয়ায় মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) আদালত এ রায় ঘোষণা করেন।

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজ কুয়েতের পাবলিক প্রসিকিউশনের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে।

যেভাবে বিরোধের সূত্রপাত

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দণ্ডপ্রাপ্ত বাংলাদেশি ও নিহত ব্যক্তি ছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কুয়েতে ওই প্রবাসীর বাসায় বেড়াতে গিয়ে তাঁর স্ত্রীর অনুমতি ছাড়াই কয়েকটি ব্যক্তিগত ছবি তোলেন বন্ধু। পরে ছবিগুলো ফেসবুকে প্রকাশ করেন তিনি।

ছবিগুলো নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তিকর ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য আসতে থাকলে সেগুলো সরিয়ে নেওয়ার জন্য বন্ধুকে বারবার অনুরোধ করেন ওই বাংলাদেশি। তবে অনুরোধ উপেক্ষা করে উল্টো আরও কিছু ছবি প্রকাশ করেন তাঁর বন্ধু।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রবাসী বাংলাদেশির পারিবারিক জীবনে অশান্তি তৈরি হয় এবং স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

কর্মস্থলের বাইরে ওত পেতে হত্যা

স্ত্রীর ব্যক্তিগত ছবি সরিয়ে না নেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে বন্ধুর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ওই প্রবাসী। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ছুরি নিয়ে তাঁদের যৌথ কর্মস্থলের বাইরে অপেক্ষা করতে থাকেন তিনি।

বন্ধু কর্মস্থল থেকে বেরিয়ে আসার পর তাঁর মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে একাধিকবার ছুরিকাঘাত করেন অভিযুক্ত। এতে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।

আদালতে অপরাধ স্বীকার

বিচার চলাকালে অভিযুক্ত বাংলাদেশি নিজের অপরাধ স্বীকার করেন। তিনি আদালতকে জানান, বারবার অনুরোধ করার পরও তাঁর স্ত্রীর ছবি ফেসবুক থেকে সরানো হয়নি। বরং বিষয়টি নিয়ে অপমানজনক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় তিনি বন্ধুকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন।

মামলার তথ্য-প্রমাণ, সিসিটিভি ফুটেজ এবং অভিযুক্তের স্বীকারোক্তি পর্যালোচনা করে আদালত হত্যাকাণ্ডটিকে ইচ্ছাকৃত ও পূর্বপরিকল্পিত বলে বিবেচনা করেন। অপরাধের গুরুত্ব ও প্রকৃতি বিবেচনায় আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন।

সূত্র: গালফ নিউজ, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা

৪ নভে, ২০২৬

জাল দলিল তৈরি করে সরকারি অর্পিত সম্পত্তি আত্মসাতের চেষ্টা, যুবকের এক বছরের কারাদণ্ড

জাল দলিল তৈরি করে সরকারি অর্পিত সম্পত্তি আত্মসাতের চেষ্টা, যুবকের এক বছরের কারাদণ্ড

ছবি: সংগৃহীত 
চট্টগ্রামে জাল দলিল তৈরি করে সরকারি অর্পিত সম্পত্তি আত্মসাতের চেষ্টার মামলায় মো. সাদেক খান নামে এক যুবককে এক বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে আরও এক মাসের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. মিজানুর রহমান এ রায় ঘোষণা করেন। তবে রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। এ কারণে তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানামূলে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

দণ্ডপ্রাপ্ত সাদেক খান নগরীর কোতোয়ালি থানার লালখান বাজার এলাকার মৃত এমএ সোবহানের ছেলে।

মামলার নথি অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরীর লালখান বাজার মৌজায় সরকারের অর্পিত সম্পত্তির তালিকাভুক্ত একটি জমি আত্মসাতের উদ্দেশ্যে জাল দলিল তৈরি করেন সাদেক খান। জমিটি মূলত টার্নার মরিসান কোম্পানি লিমিটেডের নামে নথিভুক্ত ছিল।

এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। পরে ২০১৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর কোতোয়ালি থানায় সাদেক খানের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৬, ৪৬৭, ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারায় মামলা করা হয়।

তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হলে ২০২৫ সালের ১৯ জুন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরু হয়।

দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মো. রেজাউল করিম রনি জানান, মামলায় ১২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও উপস্থাপিত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে জাল দলিল তৈরি করে সরকারি অর্পিত সম্পত্তি আত্মসাতের চেষ্টার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এ কারণে আদালত আসামিকে এক বছরের কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা জরিমানার আদেশ দিয়েছেন।

সূত্র: যুগান্তর | ৩ নভেম্বর ২০২৬


অব্যাহতি পরবর্তী ঋণের দায়ে সাবেক পরিচালক বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে খেলাপি দেখানো যাবে না: হাইকোর্ট

অব্যাহতি পরবর্তী ঋণের দায়ে সাবেক পরিচালক বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে খেলাপি দেখানো যাবে না: হাইকোর্ট

ছবি: সংগৃহীত 
অন্য একটি কোম্পানির ঋণ গ্রহণের সময় কোনো ব্যক্তি ওই কোম্পানির পরিচালক না থাকলে, ২০ শতাংশের বেশি শেয়ারের মালিক না হলে কিংবা ঋণের জামিনদার না হলে তাঁকে ওই কোম্পানির ঋণের দায়ে খেলাপি ঋণগ্রহীতা হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। একইভাবে, কেবল অতীতের ব্যবসায়িক বা পারিবারিক সম্পর্কের কারণে কোনো প্রতিষ্ঠানকে ঋণগ্রহীতা কোম্পানির স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান (Interested Concern) হিসেবে দেখিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা আইনসম্মত নয়।

এক রিট আবেদনের চূড়ান্ত শুনানি শেষে হাইকোর্ট বিভাগের একটি দ্বৈত বেঞ্চ এ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। আদালত আবেদনকারীদের নাম সিআইবি প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত, রিপোর্ট ও প্রচার করাকে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত এবং আইনগত কার্যকারিতাহীন ঘোষণা করেছেন। একই সঙ্গে সাত দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ঋণের দায়ের বিপরীতে আবেদনকারীদের নাম সিআইবি প্রতিবেদন থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

শওকত আজিজ ও অন্যান্য বনাম বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য, রিট পিটিশন নং ২১৬৫/২০২৫- মামলায় এ রায় দেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. মোজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ। ২০২৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর এ রায় ঘোষণা করা হয়। রায়টির পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় ৪ নভেম্বর, ২০২৬ তারিখে।

মামলার পটভূমি

মামলার আবেদনকারী শওকত আজিজ অ্যাম্বার গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তাঁর দাবি, ২০০৬ সালের একটি সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে তাঁর পিতা প্রয়াত এম এ হাসেমের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো পাঁচ ছেলের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় তিনি অ্যাম্বার গ্রুপের ব্যবসা পরিচালনা শুরু করেন এবং তাঁর ভাই রুবেল আজিজ পারটেক্স গ্রুপের ব্যবসা পরিচালনা করেন।

পারটেক্স ফাউন্ড্রি লিমিটেড নামের একটি কোম্পানিতে শওকত আজিজ ২০০৯ সালে পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং তাঁর মালিকানাধীন ৮ হাজার শেয়ার রুবেল আজিজের কাছে হস্তান্তর করেন। এ-সংক্রান্ত বোর্ড রেজল্যুশন, ফরম-১১৭, হলফনামা এবং কোম্পানির সংঘবিধি সংশোধনের নথিও আদালতে উপস্থাপন করা হয়।

অন্যদিকে, পারটেক্স ফাউন্ড্রি লিমিটেড পরবর্তী সময়ে যমুনা ব্যাংক পিএলসি ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি থেকে ঋণসুবিধা গ্রহণ করে। ওই ঋণের দায়ে শওকত আজিজ ও তাঁর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান হিসেবে সিআইবি প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এতে তাঁদের ব্যাংকিং সুবিধা গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়।

আবেদনকারীদের বক্তব্য ছিল, ঋণ গ্রহণের সময় তাঁরা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির পরিচালক, শেয়ারহোল্ডার, জামিনদার কিংবা বন্ধকদাতা ছিলেন না। ফলে অন্য একটি স্বতন্ত্র কোম্পানির ঋণের দায় তাঁদের ওপর চাপিয়ে সিআইবিতে অন্তর্ভুক্ত করা আইনসম্মত নয়।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্ট প্রথমে রিট আবেদনটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আলোচনা করেন। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২-এর ৪১(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক ও তার কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট কার্যক্রমের ক্ষেত্রে সুরক্ষা থাকলেও তা নিঃশর্ত নয় বলে আদালত মত দেন।

আদালত বলেন, কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষ তার আইনগত ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে কোনো পদক্ষেপ নিলে শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের অজুহাতে সেটিকে বৈধতা দেওয়া যায় না। আবেদনকারীরা ক্ষতিপূরণ দাবি করেননি; বরং তাঁদের নাম আইনগত কর্তৃত্ব ছাড়া সিআইবিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কি না, সেটিই আদালতের বিবেচ্য বিষয়। তাই সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে রিট আবেদনটি গ্রহণযোগ্য।

এরপর আদালত ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৫ ধারার (গগ) উপধারা এবং ২৭কক ধারার বিধান বিশ্লেষণ করেন।

ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৫ ধারার (গগ) উপধারার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করতে হলে তিনটি শর্তের অন্তত একটি পূরণ করতে হবে। যথা—

১. সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হতে হবে;

২. ওই প্রতিষ্ঠানের ২০ শতাংশের বেশি শেয়ারের মালিক হতে হবে; অথবা

৩. সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণের জামিনদার হতে হবে।

আদালত বলেন, ব্যাখ্যায় উল্লিখিত তিনটি শর্তের কোনোটিই পূরণ না হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ওই ব্যক্তির স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য করা যাবে না। প্রশাসনিক চর্চা, অনুমান কিংবা অন্য কোনো বিবেচনার মাধ্যমে আইনে নির্ধারিত এই সীমা সম্প্রসারণের সুযোগ নেই।

শেয়ার হস্তান্তর ও পদত্যাগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত

ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়, ঋণদাতা ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া শেয়ার হস্তান্তর ও পরিচালকের পদত্যাগ কার্যকর হয়নি। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ২৭ক ধারা প্রযোজ্য।

তবে আদালত পর্যবেক্ষণ করেন, ২০০৯ সালের ২২ জুলাই শওকত আজিজ যখন পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ ও শেয়ার হস্তান্তর করেন, তখন সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কোনো ব্যাংকঋণ বা আর্থিক দায় ছিল—এমন কোনো প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি। বরং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের নিজস্ব স্যাংশন অ্যাডভাইস অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে ২০১২ সালে ঋণসুবিধা দেওয়া হয়েছিল।

আদালত বলেন, কোনো কোম্পানি ঋণগ্রহীতা হওয়ার আগেই পরিচালকের পদত্যাগ বা শেয়ার হস্তান্তর সম্পন্ন হয়ে থাকলে পরবর্তী সময়ে কোম্পানিটি ঋণগ্রহীতা হওয়ার কারণে ২৭ক ধারাকে পূর্ববর্তী সময়ে প্রয়োগ করে সেই পদত্যাগ বা হস্তান্তর অকার্যকর ঘোষণা করা যায় না।

এ ছাড়া কোম্পানিজ অ্যাক্ট, ১৯৯৪-এর ৩৮(৩) ধারা অনুযায়ী, যথাযথভাবে সম্পাদিত শেয়ার হস্তান্তরের দলিলের ভিত্তিতে কোম্পানি শেয়ার হস্তান্তর নিবন্ধন করে। অন্যদিকে, ১১৫(২) ধারা অনুযায়ী পরিচালকদের পরিবর্তনের তথ্য রেজিস্ট্রারের কাছে পাঠানোর দায়িত্ব কোম্পানির। আদালত বলেন, ফরম-১২ মূলত পরিচালকদের বিবরণসংক্রান্ত রিটার্ন; এটি নিজে থেকে শেয়ার হস্তান্তর বা পরিচালকের পদত্যাগ বাতিল করে না।

পারিবারিক সম্পর্কের কারণে দায় আরোপ করা যাবে না

ব্যাংকের পক্ষ থেকে আরও যুক্তি দেওয়া হয়, সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালকরা শওকত আজিজের পরিবারের সদস্য এবং তিনি ঋণের সুবিধাও ভোগ করেছেন।

এ যুক্তি গ্রহণ করেননি আদালত। আদালত বলেন, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৫ ধারার (গগ) উপধারার ব্যাখ্যায় পারিবারিক সম্পর্ককে স্বার্থসংশ্লিষ্টতার স্বতন্ত্র ভিত্তি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আইনপ্রণেতা যেখানে পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তিতে দায় আরোপ করতে চেয়েছেন, সেখানে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং আইনে যেখানে এমন বিধান নেই, সেখানে ব্যাখ্যার মাধ্যমে পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তিতে দায় আরোপ করা যায় না।

আদালত আরও উল্লেখ করেন, সংশ্লিষ্ট কোম্পানির ঋণ গ্রহণের সময় শওকত আজিজ পরিচালক ছিলেন না, তাঁর ২০ শতাংশের বেশি শেয়ার মালিকানাও ছিল না এবং তিনি ঋণের জামিনদারও ছিলেন না। অন্য আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও আইনে নির্ধারিত তিনটি শর্তের কোনোটি পূরণের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

আদালতের আদেশ

উপরোক্ত পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে হাইকোর্ট রুল যথাযথ ঘোষণা করে (Rule made absolute) আবেদনকারীদের পক্ষে রায় দেন। আদালতের আদেশে বলা হয়—

* পারটেক্স ফাউন্ড্রি লিমিটেডের যমুনা ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের দায়ে আবেদনকারীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বা সিস্টার কনসার্ন হিসেবে সিআইবি প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্তি, রিপোর্ট, প্রচার ও প্রকাশ আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত এবং আইনগত কার্যকারিতাহীন।

* বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে রায়ের অনুলিপি পাওয়ার সাত দিনের মধ্যে ওই ঋণের দায়ের বিপরীতে আবেদনকারীদের নাম সিআইবি প্রতিবেদন থেকে বাদ দিতে হবে।
* ভবিষ্যতে আইনের শর্ত পূরণ না করে একই ঋণের দায়ে তাঁদের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না।
* তবে আবেদনকারী ৩ ও ৮-এর নিজস্ব ঋণসহ অন্য কোনো ঋণের দায়ে আইন অনুযায়ী তাঁদের সিআইবিতে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে এ রায় কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না।
* আবেদনকারীদের কেউ ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির পরিচালক হলে, ২০ শতাংশের বেশি শেয়ারের মালিক হলে অথবা ঋণের জামিনদার হলে এবং আইনের অন্যান্য শর্ত পূরণ হলে তাঁদের নাম সিআইবিতে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে।
* ব্যাংকগুলোর ঋণের বকেয়া অর্থ আদায়ের আইনগত অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকবে।
আদালত কোনো খরচের আদেশ দেননি।

আইনি শিক্ষা

এ রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্ট স্পষ্ট করেছেন, কোনো কোম্পানির ঋণখেলাপির দায় কেবল ব্যবসায়িক, ঐতিহাসিক কিংবা পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তিতে অন্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর আরোপ করা যায় না। ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৫ ধারার (গগ) উপধারার ব্যাখ্যায় নির্ধারিত পরিচালক, ২০ শতাংশের বেশি শেয়ার মালিকানা অথবা জামিনদার হওয়ার শর্তের অন্তত একটি পূরণ করতে হবে।

একই সঙ্গে, ঋণ গ্রহণের আগে সম্পন্ন হওয়া পরিচালকের পদত্যাগ ও শেয়ার হস্তান্তরকে পরবর্তী ঋণের কারণে পূর্ববর্তী সময়ে অকার্যকর ঘোষণা করা যাবে না। সিআইবিতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংককে অবশ্যই আইনে নির্ধারিত সীমা ও শর্ত অনুসরণ করতে হবে।

সূত্র: হাইকোর্ট বিভাগের রিট পিটিশন নং ২১৬৫/২০২৫- এর পূর্ণাঙ্গ রায়।

বিডি ল' পোস্ট/ মাসুম

৩ নভে, ২০২৬

নিবন্ধিত বিক্রয় চুক্তির শর্ত মৌখিক সাক্ষ্যের মাধ্যমে পরিবর্তন বা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না: হাইকোর্ট

নিবন্ধিত বিক্রয় চুক্তির শর্ত মৌখিক সাক্ষ্যের মাধ্যমে পরিবর্তন বা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না: হাইকোর্ট

ছবি: সংগৃহীত 
নিবন্ধিত বিক্রয় চুক্তির শর্ত মৌখিক সাক্ষ্যের মাধ্যমে পরিবর্তন বা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। একই সঙ্গে, বিবাদীরা জমির দখলে থাকলে শুধু স্বত্ব ঘোষণার মামলা করে প্রতিকার পাওয়া যাবে না; দখল পুনরুদ্ধারের আনুষঙ্গিক প্রতিকারও চাইতে হবে। এমন পর্যবেক্ষণ দিয়ে জমি নিয়ে বিরোধের একটি মামলায় দায়ের করা প্রথম আপিল খারিজ করেছেন হাইকোর্ট।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহ ও বিচারপতি মো. লুৎফর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ২১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে এ রায় দেন। মিসেস সুফিয়া খাতুন বনাম মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল ও অন্যান্য মামলায় (এফ.এ. নং ৪০০/২০১৫) আদালত বলেন, ১৯ জানুয়ারি ২০০০ তারিখের নিবন্ধিত বিক্রয় চুক্তিটি ঋণের জামানত হিসেবে সম্পাদিত হয়েছিল—বাদী তা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। রায়ের পূর্নাঙ্গ অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইট প্রকাশিত হয় ৩ নভেম্বর, ২০২৬ তারিখে।

মামলার পটভূমি

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৭৭ সালের ২৫ নভেম্বর নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে ইলিয়াস মোল্লা ও মো. আলী আকবর আলী মোল্লা বিরোধীয় জমি ক্রয় করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ সালের ১৩ মার্চ নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে তাঁরা জমিটি সুফিয়া খাতুনের কাছে বিক্রি করেন।

বাদীর দাবি ছিল, তাঁর স্বামী একটি তফসিলি ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করলে ওই ঋণের জামানত হিসেবে ২০০০ সালের ১৯ জানুয়ারি বিবাদী ১-৩-এর অনুকূলে একটি নিবন্ধিত বিক্রয় চুক্তি সম্পাদন করেন। তবে বাস্তবে জমি বিক্রির কোনো অর্থ লেনদেন হয়নি। তাঁর স্বামীর ঋণ পরিশোধের পর বন্ধকী সম্পত্তিও অবমুক্ত করা হয়।

বাদীর আরও অভিযোগ ছিল, তাঁকে যথাযথভাবে সমন জারি না করে বিবাদীরা ২০০৩ সালে সুনির্দিষ্ট কার্যসম্পাদনের মামলা দায়ের করেন এবং একতরফা ডিক্রি গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে ওই ডিক্রির ভিত্তিতে জমির দখল নেওয়া হয়। এ অবস্থায় তিনি একতরফা ডিক্রিকে জালিয়াতিপূর্ণ, যোগসাজশমূলক, বেআইনি ও তাঁর ওপর বাধ্যকর নয়—মর্মে ঘোষণার জন্য মামলা করেন।

অন্যদিকে, বিবাদীদের বক্তব্য ছিল, জমির মূল্য ৬ লাখ টাকা নির্ধারণ করে বাদী তাঁদের অনুকূলে বিক্রয় চুক্তি সম্পাদন করেন। এর মধ্যে ৩ লাখ টাকা সরাসরি এবং অবশিষ্ট ৩ লাখ টাকা পৃথক অর্থপ্রাপ্তির রসিদের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়। সম্পূর্ণ মূল্য গ্রহণের পরও বাদী বিক্রয় দলিল সম্পাদন না করায় তাঁরা সুনির্দিষ্ট কার্যসম্পাদনের মামলা করেন। ওই মামলায় একতরফা ডিক্রি পাওয়ার পর আদালতের মাধ্যমে ১৩ নভেম্বর ২০০৫ তারিখে বিক্রয় দলিল সম্পাদন করা হয়।

বিচারিক আদালতের সিদ্ধান্ত ও আপিল

খুলনার যুগ্ম জেলা জজ, তৃতীয় আদালত ১ অক্টোবর ২০১৫ তারিখে ২০০৭ সালের ৪৪৩ নম্বর স্বত্ব মামলাটি বিবাদী ১-৩-এর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলকভাবে খারিজ করেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে বাদী হাইকোর্টে প্রথম আপিল দায়ের করেন।

আপিলকারীর যুক্তি ছিল, ২০০০ সালের বিক্রয় চুক্তির বিপরীতে কোনো মূল্য পরিশোধ করা হয়নি এবং চুক্তিটি মূলত ঋণের জামানত হিসেবে সম্পাদিত হয়েছিল। এ ছাড়া ২০০৩ সালের মামলায় সমন জারির প্রক্রিয়াও আইনসম্মত ছিল না।

অন্যদিকে, বিবাদীদের পক্ষে বলা হয়, বাদী সম্পূর্ণ বিক্রয়মূল্য গ্রহণ করেছিলেন এবং আদালতের মাধ্যমে নিবন্ধিত বিক্রয় দলিলও সম্পাদিত হয়েছে। তাছাড়া বিবাদীরা জমির দখলে থাকায় শুধু স্বত্ব ঘোষণার মামলা আইনত গ্রহণযোগ্য নয়; দখল পুনরুদ্ধারের প্রতিকারও চাইতে হতো।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্ট নথিপত্র ও সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে দেখতে পান, বাদী নিজেই বিবাদী ১-৩-এর অনুকূলে ১৯ জানুয়ারি ২০০০ তারিখে নিবন্ধিত বিক্রয় চুক্তি সম্পাদনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

আদালত বলেন, প্রদর্শনী ‘খ’ হিসেবে চিহ্নিত ওই নিবন্ধিত দলিলটি পর্যালোচনায় দেখা যায়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বিক্রয় চুক্তি (Out-and-out Agreement for Sale), বন্ধকী দলিল নয়। ফলে দলিলটি ঋণের জামানত হিসেবে সম্পাদিত হয়েছিল—বাদীর এমন দাবি প্রমাণিত হয়নি।

এ প্রসঙ্গে আদালত সাক্ষ্য আইনের ৯২ ধারার উল্লেখ করে বলেন, লিখিত চুক্তির শর্তাবলি মৌখিক সাক্ষ্যের মাধ্যমে পরিবর্তন বা ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা যায় না। বিশেষ করে নিবন্ধিত দলিলের বিষয়বস্তু মৌখিক সাক্ষ্য দিয়ে পরিবর্তনের সুযোগ নেই। অতএব, নিবন্ধিত বিক্রয় চুক্তিকে ঋণের জামানত হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য বাদীর মৌখিক বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়।

সমন জারির বিষয়ে আদালত উল্লেখ করেন, ২০০৩ সালের ১৫ নম্বর স্বত্ব মামলায় বাদীর মেয়ে শায়লা শারমিনের কাছে সমন জারি করা হয়েছিল বলে মামলার প্রসেস সার্ভার ডি.ডব্লিউ.৩ মো. কামরুজ্জামান সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাঁর সাক্ষ্য অনুযায়ী, বাদীর মেয়ে সমন গ্রহণ করেছিলেন। এ ছাড়া বাদীর স্বামী আকবর আলী মোল্লা বিক্রয় চুক্তির একজন সাক্ষী ছিলেন। এসব বিষয় বিবেচনায় বিচারিক আদালত যথাযথভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, বিবাদীরা জালিয়াতির মাধ্যমে একতরফা ডিক্রি গ্রহণ করেছেন—এমন অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।

আদালত আরও উল্লেখ করেন, বিচারিক আদালত প্রদর্শনী ‘গ’, ‘গ-১’ ও ‘গ-২’ হিসেবে চিহ্নিত অর্থপ্রাপ্তির রসিদ পর্যালোচনা করে বিবাদীদের কাছ থেকে বাদীর ৩ লাখ টাকা গ্রহণের বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত পেয়েছেন।

স্বত্ব ঘোষণার পাশাপাশি দখল পুনরুদ্ধারের প্রতিকার চাওয়ার প্রয়োজনীয়তা

মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল জমির দখলসংক্রান্ত প্রশ্ন। হাইকোর্টের কাছে স্বীকৃত বিষয় ছিল, বিবাদীরা বিরোধীয় জমির দখলে রয়েছেন।

এ বিষয়ে আদালত বলেন, বিবাদীরা জমির দখলে থাকা অবস্থায় বাদী শুধু স্বত্ব ঘোষণার জন্য মামলা করতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে দখল পুনরুদ্ধারের মতো আনুষঙ্গিক প্রতিকার না চাওয়ায় মামলাটি আইনত গ্রহণযোগ্য নয়। শুধু এ কারণেও মামলাটি খারিজযোগ্য।

আপিল খারিজ

সার্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ, নিবন্ধিত দলিল এবং উভয় পক্ষের বক্তব্য পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট বলেন, বিচারিক আদালতের ১ অক্টোবর ২০১৫ তারিখের রায় ও ডিক্রিতে হস্তক্ষেপ করার মতো কোনো যুক্তিসংগত কারণ পাওয়া যায়নি। বিচারিক আদালতের সিদ্ধান্ত মৌখিক ও দালিলিক সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে যথাযথভাবে দেওয়া হয়েছে।

ফলে হাইকোর্ট প্রথম আপিলটি খরচ ছাড়া খারিজ করেন।

আইনি শিক্ষা

এ রায়ের মাধ্যমে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি নীতি পুনর্ব্যক্ত হয়েছে—

১. নিবন্ধিত লিখিত চুক্তির শর্ত সাক্ষ্য আইনের ৯২ ধারার অধীনে মৌখিক সাক্ষ্যের মাধ্যমে পরিবর্তন বা ভিন্নভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

২. নিবন্ধিত বিক্রয় চুক্তিকে ঋণের জামানত হিসেবে দাবি করলে কেবল মৌখিক বক্তব্য যথেষ্ট নয়; উপযুক্ত আইনগত ও দালিলিক ভিত্তিতে তা প্রমাণ করতে হবে।

৩. একতরফা ডিক্রি জালিয়াতির মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ যথাযথ সাক্ষ্যপ্রমাণ দিয়ে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

৪. বিবাদী জমির দখলে থাকলে শুধু স্বত্ব ঘোষণার প্রতিকার চাওয়া যথেষ্ট নয়; প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক প্রতিকার হিসেবে দখল পুনরুদ্ধারের দাবিও উত্থাপন করতে হবে।

মামলার বিবরণ: মিসেস সুফিয়া খাতুন বনাম মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল ও অন্যান্য, এফ.এ. নং ৪০০/২০১৫; রায়ের তারিখ: ২১ এপ্রিল ২০২৬।

২ নভে, ২০২৬

আদালতের হেফাজতে মূল দলিল হারালে গৌণ সাক্ষ্য হিসেবে সত্যায়িত অনুলিপি গ্রহণ করতে হবে, অর্থঋণ আদালতকে হাইকোর্টের নির্দেশ

আদালতের হেফাজতে মূল দলিল হারালে গৌণ সাক্ষ্য হিসেবে সত্যায়িত অনুলিপি গ্রহণ করতে হবে, অর্থঋণ আদালতকে হাইকোর্টের নির্দেশ

আদালতের হেফাজতে থাকা মূল দলিল হারিয়ে গেলে তার সত্যায়িত অনুলিপি সাক্ষ্য আইনের অধীনে গৌণ সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য; ঋণগ্রহীতার দায় স্বীকারও নতুন করে প্রমাণের প্রয়োজনীয়তা দূর করে 
অর্থঋণ মামলায় ব্যাংকের দাখিল করা মূল দলিল আদালতের হেফাজতে থাকা অবস্থায় হারিয়ে গেলে শুধু মূল দলিল উপস্থাপন করতে না পারার কারণে মামলা খারিজ করা আইনসম্মত নয় বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে মূল দলিলের সত্যায়িত অনুলিপি সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ৬৩ ও ৬৫ ধারার অধীনে গৌণ সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য। একই সঙ্গে ঋণগ্রহীতা অন্য মামলায় ঋণের দায় স্বীকার করলে তা সাক্ষ্য আইনের ৫৮ ধারার অধীনে স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হবে, যার জন্য নতুন করে প্রমাণ উপস্থাপনের প্রয়োজন নেই।

সম্প্রতি প্রকাশিত এক রায়ে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার এবং বিচারপতি মাহমুদ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ রূপালী ব্যাংক লিমিটেড বনাম মেসার্স পুবালী ট্যানারিজ ও অন্যান্য মামলাটি ফার্স্ট আপিল নং ১১৮/২০১৫ -এ এমন পর্যবেক্ষণ দেন।

মামলার পটভূমি

রূপালী ব্যাংক লিমিটেড বনাম মেসার্স পুবালী ট্যানারিজ ও অন্যান্য মামলাটি ফার্স্ট আপিল নং ১১৮/২০১৫। মামলাটির সূত্রপাত অর্থঋণ মামলা নং ১৭৭/২০০৬ থেকে। রূপালী ব্যাংক ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান মেসার্স পুবালী ট্যানারিজ, এর স্বত্বাধিকারী, বন্ধকদাতা ও জামিনদারদের বিরুদ্ধে বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রির মাধ্যমে ৩৬ কোটি ৯ লাখ ১৩ হাজার ৯০১ টাকা আদায়ের জন্য অর্থঋণ আদালতে মামলা দায়ের করে।

মামলা দায়েরের সময় ব্যাংক ঋণ অনুমোদনপত্র, দায় স্বীকারপত্র, ঋণসংক্রান্ত দলিল এবং হিসাব বিবরণীসহ প্রয়োজনীয় মূল কাগজপত্র ফিরিস্তির মাধ্যমে আদালতে দাখিল করে। এসব দলিল মামলার নথিতে যথাযথভাবে লিপিবদ্ধও ছিল।

মামলা চলাকালে ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানটি রুগ্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার আবেদন করে এবং পরবর্তী সময়ে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন নং ২১৩৬/২০১০ দায়ের করে। ওই রিটে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংকের কাছে তার দায় স্বীকার করে।

পরবর্তী সময়ে অর্থঋণ মামলাটি একতরফা শুনানির জন্য নির্ধারিত হলে বিচারিক আদালত ব্যাংককে মূল দলিলগুলো পুনরায় দাখিল করতে নির্দেশ দেন। কিন্তু পরে দেখা যায়, আদালতের হেফাজতে থাকা মূল দলিলগুলো হারিয়ে গেছে। এতে ব্যাংকের কোনো অবহেলা বা দায় ছিল না। এ অবস্থায় ব্যাংক ২ সেপ্টেম্বর ২০১৫ তারিখে দলিলগুলোর সত্যায়িত ফটোকপি গৌণ সাক্ষ্য হিসেবে দাখিল করে।

তবে বিচারিক আদালত মূল দলিল উপস্থাপন করতে না পারার কারণ দেখিয়ে মামলাটি খারিজ করেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে ব্যাংক হাইকোর্টে আপিল করে।

আইনজীবীদের বক্তব্য ও শুনানি

আপিলকারী রূপালী ব্যাংক লিমিটেডের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাডভোকেট মো. ইমাম হাসান। তিনি আদালতে যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন, ব্যাংক মামলা দায়েরের সময় ফিরিস্তির মাধ্যমে মূল দলিলগুলো যথাযথভাবে দাখিল করেছিল। পরবর্তী সময়ে আদালতের হেফাজতে থাকাকালে দলিলগুলো হারিয়ে যায়, যার জন্য ব্যাংক দায়ী নয়। এ অবস্থায় দাখিল করা সত্যায়িত অনুলিপিগুলো সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ৬৩ ও ৬৫ ধারার অধীনে গৌণ সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য।

তিনি আরও যুক্তি দেন, ঋণগ্রহীতা হাইকোর্ট বিভাগে দায়ের করা রিট পিটিশনে ব্যাংকের কাছে তার দায় স্বীকার করেছে, যা সাক্ষ্য আইনের ৫৮ ধারার অধীনে স্বীকৃতি এবং এর জন্য নতুন করে প্রমাণের প্রয়োজন নেই।

অন্যদিকে, আপিলে বিবাদী পক্ষের কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চ নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখতে পান, ব্যাংক মামলা দায়েরের সময়ই মূল দলিলগুলো যথাযথভাবে আদালতে দাখিল করেছিল। পরবর্তী সময়ে আদালতের হেফাজতে থাকাকালে সেগুলো হারিয়ে যায় এবং এ ঘটনায় ব্যাংকের কোনো অবহেলা ছিল না।

আদালত বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে দাখিল করা সত্যায়িত অনুলিপিগুলো সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ৬৩ ও ৬৫ ধারার অধীনে গৌণ সাক্ষ্য হিসেবে স্পষ্টতই গ্রহণযোগ্য। ফলে মূল দলিল আদালতের হেফাজতে হারিয়ে যাওয়ার কারণে ব্যাংককে তার আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না।

আদালত আরও উল্লেখ করেন, ঋণগ্রহীতা হাইকোর্ট বিভাগে দায়ের করা রিট পিটিশনে ব্যাংকের কাছে তার দায় স্বীকার করেছে। সাক্ষ্য আইনের ৫৮ ধারার অর্থে এটি একটি স্বীকৃতি (Admission), যা সংশ্লিষ্ট বিষয়টি নতুন করে প্রমাণ করার প্রয়োজনীয়তা দূর করে।

এ ছাড়া অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ১৯(৬) ধারার অধীনে বিচারিক আদালত হলফনামা ও দালিলিক সাক্ষ্যের ভিত্তিতে মামলা নিষ্পত্তি করতে পারেন। সুতরাং, গ্রহণযোগ্য গৌণ সাক্ষ্য আদালতের নথিতে থাকা সত্ত্বেও শুধু মূল দলিল অনুপস্থিত থাকার কারণে মামলা খারিজ করা আইনসম্মত নয়।

এ প্রসঙ্গে আদালত Janata Bank Limited বনাম Diniat Begum and others, 2 ALR 160 এবং Osman Gazi Chowdhury বনাম Artha Rin Adalat and another, 21 BLC 322 মামলার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করেন। এসব সিদ্ধান্তে মূল দলিল হারিয়ে গেলে গৌণ সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হওয়ার বিষয়টি স্বীকৃত হয়েছে।

আদালতের আদেশ

হাইকোর্ট আপিলটি মঞ্জুর করে অর্থঋণ আদালতের দেওয়া পূর্ববর্তী রায় ও ডিক্রি বাতিল করেন। একই সঙ্গে মামলাটি পুনরায় নিষ্পত্তির জন্য বিচারিক আদালতে ফেরত পাঠান।

বিচারিক আদালতকে ব্যাংকের দাখিল করা সত্যায়িত অনুলিপিগুলো গৌণ সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে আইন অনুযায়ী মামলাটি নতুন করে নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আপিল নিষ্পত্তিতে কোনো খরচের আদেশ দেওয়া হয়নি।

আইনি শিক্ষা

এই রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্ট স্পষ্ট করেছেন, আদালতের হেফাজতে থাকা অবস্থায় কোনো মামলার মূল দলিল হারিয়ে গেলে তার দায় সংশ্লিষ্ট পক্ষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। মূল দলিল হারানোর কারণে গৌণ সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতা নাকচ করা যাবে না, যদি সাক্ষ্য আইনের শর্ত পূরণ হয়।

একই সঙ্গে কোনো পক্ষ আদালতের অন্য কার্যক্রমে দায় স্বীকার করলে সাক্ষ্য আইনের ৫৮ ধারার অধীনে সেই স্বীকৃতির প্রমাণমূল্য বিবেচনা করতে হবে। অর্থঋণ মামলায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আদালতকে দাখিল করা গ্রহণযোগ্য দালিলিক সাক্ষ্য যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।

মামলার তথ্যসূত্র

মামলা: রূপালী ব্যাংক লিমিটেড বনাম মেসার্স পুবালী ট্যানারিজ ও অন্যান্য
ফার্স্ট আপিল নং: ১১৮/২০১৫
মূল মামলা: অর্থঋণ মামলা নং ১৭৭/২০০৬
আদালত: হাইকোর্ট বিভাগ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
বেঞ্চ: বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি মাহমুদ হাসান
শুনানির তারিখ: ২ নভেম্বর ২০২৫
রায়ের তারিখ: ১৩ নভেম্বর ২০২৫
প্রাসঙ্গিক আইন: সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ৫৮, ৬৩ ও ৬৫ ধারা; অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ১৯(৬) ধারা।
রায়ের কপি: সংযুক্ত ৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়।
সূত্র: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ।

বিডি ল' পোস্ট/মাসুম

দেওয়ানি কার্যবিধির বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া রায়ের আগে সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ অবৈধ: হাইকোর্ট

দেওয়ানি কার্যবিধির বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া রায়ের আগে সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ অবৈধ: হাইকোর্ট

প্রাসঙ্গিক আইন: দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮-এর আদেশ ৩৮-এর বিধি ৫ ও ৬ এবং ধারা ১৫১।
রায় ঘোষণার আগে বিবাদীর সম্পত্তি ক্রোকের ক্ষেত্রে দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৩৮-এর বিধি ৫ ও ৬ অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। এসব বিধিতে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কেবল পাওনা আদায়ের আশঙ্কা বা সাধারণ যুক্তির ভিত্তিতে সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দেওয়া যায় না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

সম্প্রতি বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের একটি বেঞ্চ রিট পিটিশন নং ২৪৯৮/২০২৬-এর চূড়ান্ত শুনানি শেষে এ রায় দেন। আদালত অর্থঋণ আদালতের দেওয়া সম্পত্তি ক্রোকের আদেশকে আইনবহির্ভূত ঘোষণা করে তা বাতিল করেন।

মামলার প্রেক্ষাপট

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, একটি ব্যাংক তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরীসহ আটজনের বিরুদ্ধে ১৪৮ কোটি ১৯ লাখ ২ হাজার ৮১০ টাকা ৪২ পয়সা আদায়ের দাবিতে অর্থঋণ মামলা দায়ের করে। মামলাটি প্রথমে অর্থঋণ মামলা নং ৩৩৭/২০২৫ হিসেবে দায়ের করা হলেও পরবর্তী সময়ে অর্থঋণ আদালত-৫, ঢাকায় ৩৪৩/২০২৫ নম্বরে পুনর্নম্বরকরণ করা হয়।

বিবাদীপক্ষ লিখিত জবাব দাখিলের পর ব্যাংক দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৩৮-এর বিধি ৫ এবং ধারা ১৫১ অনুসারে রায় ঘোষণার আগে বিবাদীদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ক্রোকের আবেদন করে।

পরবর্তী সময়ে অর্থঋণ আদালত যথাযথ কারণ দর্শানোর নোটিশ ও প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর ক্রোকের আবেদন মঞ্জুর করেন। এতে সংক্ষুব্ধ হয়ে বিবাদীপক্ষের একজন হাইকোর্ট বিভাগে রিট দায়ের করেন। প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুল জারি করেন এবং সংশ্লিষ্ট আদেশের কার্যকারিতা স্থগিত করেন।

রিটকারীর যুক্তি

রিটকারীর পক্ষে আইনজীবী তাইসির হক শুনানিতে যুক্তি দেন, দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৩৮-এর বিধি ৫ অনুযায়ী সম্পত্তি ক্রোকের আগে আদালতের কাছে সন্তোষজনকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে যে, বিবাদী সম্ভাব্য ডিক্রি কার্যকর করার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত বা বিলম্বিত করার উদ্দেশ্যে তার সম্পত্তি হস্তান্তর কিংবা আদালতের এখতিয়ার থেকে সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করছেন।

কিন্তু ব্যাংক এ ধরনের আশঙ্কার পক্ষে প্রয়োজনীয় প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। তাছাড়া বিবাদীকে জামানত দিতে অথবা কেন জামানত দেওয়া হবে না, সে বিষয়ে কারণ দর্শানোর সুযোগ না দিয়েই ক্রোকের আদেশ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে ব্যাংকের পক্ষে আইনজীবী মারগুব কবির ও আইনজীবী তাইসির মাহমুদ রিট আবেদন খারিজের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, ব্যাংকের আবেদনে সম্পত্তি হস্তান্তরের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং ঋণ পরিশোধ এড়াতে বিবাদীরা সম্পত্তি হস্তান্তরের চেষ্টা করছেন। ফলে অর্থঋণ আদালতের আদেশ যথাযথ ছিল।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত

উভয় পক্ষের বক্তব্য ও মামলার নথি পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট বলেন, দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৩৮-এর বিধি ৫ ও ৬-এ সম্পত্তি ক্রোকের আগে একটি সুনির্দিষ্ট ও বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রথমে আদালতকে বিবাদীকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পত্তির মূল্য বা সমপরিমাণ জামানত জমা দিতে নির্দেশ দিতে হবে অথবা কেন জামানত দেওয়া হবে না, সে বিষয়ে কারণ দর্শানোর সুযোগ দিতে হবে। বিবাদী ওই নির্দেশ পালনে ব্যর্থ হলেই কেবল পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা হিসেবে সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দেওয়া যেতে পারে।

আদালত পর্যবেক্ষণে আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট অর্থঋণ আদালত দেওয়ানি কার্যবিধির বিধানগুলো যথাযথভাবে পর্যালোচনা না করেই সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দিয়েছেন। আইনে নির্ধারিত বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে দেওয়া এমন আদেশ আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

পরিশেষে হাইকোর্ট রুল যথাযথ ঘোষণা করে সম্পত্তি ক্রোকের পূর্ববর্তী আদেশ বাতিল করেন। তবে আদালত স্পষ্ট করেন, আইন অনুযায়ী যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ব্যাংক চাইলে নতুন করে সম্পত্তি ক্রোকের আবেদন করতে পারবে।

আইনি শিক্ষা

দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৩৮-এর বিধি ৫ ও ৬ অনুযায়ী, রায় বা ডিক্রি ঘোষণার আগে বিবাদীর সম্পত্তি ক্রোক কোনো স্বয়ংক্রিয় প্রতিকার নয়। এ ধরনের আদেশের জন্য বিবাদীর পক্ষ থেকে সম্ভাব্য ডিক্রি কার্যকর করার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত বা বিলম্বিত করার উদ্দেশ্যে সম্পত্তি হস্তান্তর কিংবা আদালতের এখতিয়ারের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার আশঙ্কা থাকতে হবে।

একই সঙ্গে বিবাদীকে জামানত প্রদান অথবা কারণ দর্শানোর যথাযথ সুযোগ দিতে হবে। এসব বাধ্যতামূলক শর্ত পূরণ না করে দেওয়া সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ আইনগতভাবে টেকসই নয়।

মামলার তথ্য: রিট পিটিশন নং ২৪৯৮/২০২৬।

আদালত: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ।

বিচারপতি: বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিম।

রিটকারীর আইনজীবী: তাইসির হক।

ব্যাংকের আইনজীবী: মারগুব কবির ও তাইসির মাহমুদ।

সূত্র: কালবেলা

১ নভে, ২০২৬

ভুল এসএ রেকর্ডের কারণে মালিকানা হারাবেন না জমির প্রকৃত মালিক: হাইকোর্ট

ভুল এসএ রেকর্ডের কারণে মালিকানা হারাবেন না জমির প্রকৃত মালিক: হাইকোর্ট

১৯২৭ সালের নিবন্ধিত কবুলিয়ত ও দখলের প্রমাণ থাকায় ৪০ শতাংশ জমির মালিকানা স্বীকার, সরকারের খাস খতিয়ানে রেকর্ডকে ভুল ঘোষণা 
জমির এসএ খতিয়ানে সরকারের নামে খাস হিসেবে রেকর্ড করা হলেই প্রকৃত মালিকের স্বত্ব বিলুপ্ত হয় না। যথাযথ দলিল, খাজনা পরিশোধের রসিদ এবং দখলের প্রমাণ দিয়ে মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা গেলে ভুল রেকর্ডের কারণে কোনো ব্যক্তির স্বত্ব কেড়ে নেওয়া যায় না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

সম্প্রতি বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খানের একক বেঞ্চ আবদুল মান্নান ও অন্যান্য বনাম বাংলাদেশ সরকার ও অন্যান্য, সিভিল রিভিশন নং ৪০৫৯/২০০৮ মামালয় এ রায় দেন। ২৫ জুন ২০২৬ তারিখে দেওয়া রায়ে আদালত কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা জজ, প্রথম আদালতের দেওয়া পূর্ববর্তী রায় বাতিল করে নিম্ন আদালতের স্বত্ব ঘোষণার ডিক্রি পুনর্বহাল করেন। রায়ের পূর্নাঙ্গ অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ০১ নভেম্বর, ২০২৬ তারিখে।

মামলার পটভূমি

মামলার বাদীরা কুমিল্লার লাকসাম এলাকার ৭০৭ নম্বর দাগের ৪০ শতাংশ জমির মালিকানা দাবি করে ১৯৮৭ সালে স্বত্ব ঘোষণার মামলা দায়ের করেন। তাঁদের দাবি, ১৯২৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর নিবন্ধিত দুটি কবুলিয়তের মাধ্যমে তাঁদের পূর্বসূরি রহিমউদ্দিন জমিদারের কাছ থেকে ৪০ শতাংশ জমি বন্দোবস্ত নেন। এরপর জমিদারকে খাজনা প্রদান এবং জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর সরকারকে খাজনা দিয়ে তাঁরা জমিটি ভোগদখল করে আসছিলেন।

জমিতে বাড়িঘর নির্মাণ, পুকুর খনন এবং পূর্বসূরিদের কবরস্থানও ছিল। কিন্তু এসএ জরিপে জমির একটি অংশ সরকারের খাস খতিয়ানে রেকর্ড করা হলে বিরোধের সৃষ্টি হয়।

অন্যদিকে, সরকার দাবি করে, সংশ্লিষ্ট জমির মূল রেকর্ডে সেটি গাবাম ভূমি হিসেবে উল্লেখ ছিল এবং এ ধরনের জমি ব্যক্তিগত বন্দোবস্ত দেওয়ার সুযোগ ছিল না। ফলে বাদীদের জমির ওপর কোনো স্বত্ব বা দখল নেই।

নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত

১৯৯০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি লাকসামের সিনিয়র সহকারী জজ আদালত বাদীদের পক্ষে স্বত্ব ঘোষণার ডিক্রি দেন। তবে সরকারের আপিলের পর ২০০৮ সালের ২৮ জুলাই কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা জজ, প্রথম আদালত সেই ডিক্রি বাতিল করে দেন।

এরপর বাদীরা হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন দায়ের করেন।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্ট মামলার দলিলপত্র, সাক্ষ্য এবং অ্যাডভোকেট কমিশনারের তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখতে পান, ১৯২৭ সালের দুটি নিবন্ধিত কবুলিয়তের মাধ্যমে বাদীদের পূর্বসূরি জমির মালিকানা অর্জন করেছিলেন। সরকার ওই কবুলিয়ত দুটি জাল বা ভুয়া প্রমাণ করতে পারেনি।

আদালত আরও দেখতে পান, জমিদারকে দেওয়া খাজনার রসিদে কবুলিয়তের তফসিল অনুযায়ী জমির সীমানার উল্লেখ রয়েছে। অ্যাডভোকেট কমিশনারের প্রতিবেদনেও বিরোধপূর্ণ জমি কবুলিয়তে বর্ণিত সীমানার অন্তর্ভুক্ত বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ২০ ধারার বিধান বিশ্লেষণ করে আদালত বলেন, ওই ধারায় যেসব শ্রেণির জমি জমিদার বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিজেদের দখলে রাখতে পারবেন না, তার মধ্যে গাবাম ভূমির কোনো উল্লেখ নেই। ফলে শুধু গাবাম ভূমি হিসেবে সিএস খতিয়ানে রেকর্ড থাকার কারণে জমিটি বন্দোবস্তের অযোগ্য ছিল—আপিল আদালতের এমন সিদ্ধান্ত আইনসম্মত নয়।

আদালত আরও লক্ষ করেন, একই দাগের ১.৪৪ একর জমির মধ্যে ৮২ শতাংশ এসএ খতিয়ানে করবান আলীর নামে এবং অবশিষ্ট ৬২ শতাংশ সরকারের খাস খতিয়ানে রেকর্ড করা হয়েছিল। অথচ একই জমিদারের কাছ থেকে একই সময়ে করবান আলী ও বাদীদের পূর্বসূরি পৃথক কবুলিয়তের মাধ্যমে জমি বন্দোবস্ত নিয়েছিলেন। এ অবস্থায় একই দাগের একাংশকে বন্দোবস্তযোগ্য এবং অন্য অংশকে বন্দোবস্তের অযোগ্য বিবেচনা করা বৈষম্যমূলক।

আদালত বলেন, স্বত্ব ও দখলের প্রাথমিক ধারণা তৈরিতে খতিয়ান গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর প্রমাণমূল্য খণ্ডনযোগ্য। যথাযথ মৌখিক ও দালিলিক প্রমাণ দিয়ে ভুল রেকর্ডের বিষয়টি খণ্ডন করা সম্ভব।

বিশেষভাবে আদালত উল্লেখ করেন, বাদীরা দুটি নিবন্ধিত কবুলিয়তের মাধ্যমে মোট ৪০ শতাংশ জমির মালিকানা দাবি করেছিলেন। এর মধ্যে একটি কবুলিয়ত (দলিল নম্বর ৪৪১১) প্রদর্শনী-১ হিসেবে চিহ্নিত হলেও অন্যটি (দলিল নম্বর ৪৪১০) যথাসময়ে আদালতে দাখিল করা সত্ত্বেও অসাবধানতাবশত প্রদর্শনী হিসেবে চিহ্নিত হয়নি। শুধু প্রদর্শনী নম্বর না দেওয়ার কারণে বাদীদের দাবি ক্ষতিগ্রস্ত করা ন্যায়সংগত নয়। তাই হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের নথিতে থাকা দ্বিতীয় কবুলিয়তটিও বিবেচনায় নেন।

আদালতের সিদ্ধান্ত

হাইকোর্টের মতে, বাদীরা তাঁদের স্বত্ব ও দখল যথাযথ দলিল, খাজনার রসিদ এবং সাক্ষ্যপ্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন। বিপরীতে, সরকার বিরোধপূর্ণ জমির ওপর নিজেদের স্বত্ব বা দখলের কোনো গ্রহণযোগ্য ভিত্তি দেখাতে পারেনি।

এ অবস্থায় পরবর্তী এসএ বা অন্য কোনো রেকর্ড ভুল ঘোষণার পৃথক প্রতিকার না চাইলেও বাদীদের স্বত্ব ঘোষণার মামলাটি বর্তমান কাঠামোয় গ্রহণযোগ্য।

হাইকোর্টের আদেশ

হাইকোর্ট রুল অ্যাবসলিউট (Rule Absolute) ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে ২০০৮ সালের ২৮ জুলাই কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা জজ, প্রথম আদালতের দেওয়া রায় ও ডিক্রি বাতিল করেন এবং ১৯৯০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি লাকসামের সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের দেওয়া স্বত্ব ঘোষণার ডিক্রি পুনর্বহাল করেন। তবে কোনো পক্ষকে মামলার খরচ প্রদান করতে নির্দেশ দেওয়া হয়নি।

আইনি শিক্ষা

এই রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্ট পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, খতিয়ানে ভুল রেকর্ড থাকলেই প্রকৃত মালিকের স্বত্ব বিলুপ্ত হয় না। নিবন্ধিত দলিল, দীর্ঘদিনের দখল, খাজনা পরিশোধের রসিদ এবং অন্যান্য গ্রহণযোগ্য প্রমাণের মাধ্যমে মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা গেলে ভুল রেকর্ডের বিরুদ্ধে আদালত প্রতিকার দিতে পারেন। পাশাপাশি, আদালতে যথাসময়ে দাখিল করা কোনো গুরুত্বপূর্ণ দলিল অসাবধানতাবশত প্রদর্শনী হিসেবে চিহ্নিত না হলেও ন্যায়বিচারের স্বার্থে তা বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।

বিডি ল' পোস্ট/মাসুম

আইনজীবী হলেই জনস্বার্থের দোহাই দিয়ে যেকোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করা যায় না: হাইকোর্ট

আইনজীবী হলেই জনস্বার্থের দোহাই দিয়ে যেকোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করা যায় না: হাইকোর্ট

প্রাসঙ্গিক আইন ও নীতি: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ; লোকাস স্ট্যান্ডি (Locus Standi); জনস্বার্থ মামলা (Public Interest Litigation); Approbate and Reprobate নীতি।

পাশের জমির মালিক বা প্রতিবেশী হওয়ার কারণে রাজউকের প্লট বরাদ্দ চ্যালেঞ্জ করার আইনগত অধিকার সৃষ্টি হয় না; সরাসরি আইনগত স্বার্থ ও অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করতে হবে বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

রাজধানীর বনানীতে একটি আবাসিক প্লট বিকল্প বরাদ্দের মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিট আবেদন খারিজ করেছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, কেবল আইনজীবী হওয়া কিংবা আইন ও জনস্বার্থ রক্ষার সাধারণ দায়িত্ব পালনের দাবি করলেই কোনো ব্যক্তি সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রতিটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করার অধিকার অর্জন করেন না। এ জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ব্যক্তিগত, সম্পত্তিগত অথবা আইনস্বীকৃত স্বার্থ থাকতে হবে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. ইকবাল কবির ও বিচারপতি এস এম সাইফুল ইসলাম সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ গত ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে রিট পিটিশন নং ১১৮২৮/২০১৬, আবদুল বাসেত মজুমদার (মৃত) ও অন্যান্য বনাম রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও অন্যান্য  মামলার রায়ে এ পর্যবেক্ষণ দেন। রায়টি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ১ নভেম্বর, ২০২৬ তারিখে। 

মামলার ঘটনা

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, রাজধানীর বনানী আবাসিক এলাকার ১১ নম্বর সড়কের ডি ব্লকের ২৪ নম্বর প্লটটি রাজউক ২০০৬ সালের ১৪ ডিসেম্বর মো. জিয়াউল হক মিয়ানের অনুকূলে বিকল্প প্লট হিসেবে বরাদ্দ দেয়। এর আগে ১৯৯৫ সালে তাঁকে গুলশান আবাসিক এলাকায় একটি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু লেকের লে-আউট পরিকল্পনা চূড়ান্ত না হওয়ায় রাজউক ওই প্লটের দখল বুঝিয়ে দিতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বনানীর প্লটটি বিকল্প হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া হয়।

বরাদ্দের পর রাজউকের সঙ্গে ২০০৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর একটি নিবন্ধিত লিজ দলিল সম্পাদিত হয়। পরবর্তী সময়ে প্লটটি একাধিকবার হস্তান্তরিত হয় এবং সর্বশেষ এলিগ্যান্ট ওয়াশিং প্ল্যান্ট লিমিটেডের নামে মালিকানা ও নামজারি সম্পন্ন হয়। ওই জমিতে ১০ তলা ভবন নির্মাণের নকশাও অনুমোদন করে রাজউক।

অন্যদিকে, মূল রিটকারী আবদুল বাসেত মজুমদারের বক্তব্য ছিল, তাঁর স্ত্রীর মালিকানাধীন জমির পাশের এই প্লটটি দীর্ঘদিন খালি জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। সেখানে ওয়াসার পাম্প ও অন্যান্য স্থাপনা ছিল। তাঁর অভিযোগ, কোনো বিধিমালা বা নীতিমালায় বিকল্প প্লট বরাদ্দের বিধান না থাকা সত্ত্বেও রাজউক বেআইনিভাবে প্লটটি বরাদ্দ দিয়েছে। এ ছাড়া জমিটি আবাসিক প্লট হিসেবে বরাদ্দ দেওয়ার আগে যথাযথ প্রক্রিয়ায় রূপান্তর এবং প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তি ও দরপত্র আহ্বান করা প্রয়োজন ছিল।

এসব অভিযোগে তিনি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে রিট আবেদন করেন। পরবর্তী সময়ে মূল রিটকারীর মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারীরা মামলাটি পরিচালনা করেন।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্ট বলেন, রিটকারী নিজে বিতর্কিত জমির মালিকানা, চুক্তিগত অধিকার, আর্থিক দায়বদ্ধতা কিংবা অন্য কোনো আইনস্বীকৃত স্বার্থ প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। তাঁর স্ত্রীর পাশের জমির মালিকানা ও সেখানে বসবাসের বিষয়টি স্বীকার করলেও তা বিতর্কিত প্লটের ওপর রিটকারীর কোনো স্বত্ব বা বলবৎযোগ্য অধিকার সৃষ্টি করে না।

আদালত আরও বলেন, কোনো জমির প্রতিবেশী বা সংলগ্ন জমির মালিক হওয়া মাত্রই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সরকারি জমির বরাদ্দের বিরুদ্ধে আপত্তি জানানোর কিংবা বরাদ্দ প্রক্রিয়া বন্ধ করার আইনগত অধিকার অর্জন করেন না। এ ধরনের অধিকার দাবি করতে হলে সংশ্লিষ্ট জমিতে সরাসরি আইনগত স্বার্থ অথবা অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার বিষয়টি দেখাতে হবে।

আইনজীবী হিসেবে রিটকারীর অবস্থান নিয়েও আদালত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দেন। আদালত বলেন, আইনজীবী হওয়ার কারণে কোনো ব্যক্তি সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রতিটি প্রশাসনিক কার্যক্রমের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করার সীমাহীন অধিকার পান না। আইন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পেশাগত দায়িত্ব থাকলেও তা একাই রিট দায়েরের জন্য প্রয়োজনীয় লোকাস স্ট্যান্ডি বা মামলা করার আইনগত অধিকার সৃষ্টি করে না।

জনস্বার্থে মামলা করার ক্ষেত্রেও আদালত বলেন, কেবল জনস্বার্থের কথা উল্লেখ করলেই কোনো আবেদন জনস্বার্থমূলক মামলা হয়ে যায় না। এ ক্ষেত্রে প্রকৃত জনস্বার্থ সংশ্লিষ্টতা এবং জনস্বার্থে মামলা করার গ্রহণযোগ্য ভিত্তি থাকতে হবে।

পরস্পরবিরোধী অবস্থান গ্রহণ নিয়েও প্রশ্ন

আদালত রিটকারীর বক্তব্যে পরস্পরবিরোধিতা দেখতে পান। একদিকে তিনি সংলগ্ন জমির মালিক হিসেবে বিতর্কিত প্লটটি পাওয়ার ক্ষেত্রে নিজের স্বার্থের কথা বলেছেন। অন্যদিকে একই জমিকে উন্মুক্ত স্থান বা জনসাধারণের ব্যবহারের জায়গা দাবি করে ব্যক্তিগত বরাদ্দের বিরোধিতা করেছেন।

আদালত বলেন, একই মামলায় কোনো পক্ষকে পরস্পরবিরোধী অবস্থান গ্রহণের সুযোগ দেওয়া যায় না। আইন অনুযায়ী একজন litigant একই সঙ্গে পরস্পরবিরোধী দাবি বা অবস্থান গ্রহণ করে নিজের সুবিধামতো প্রতিকার চাইতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে Approbate and Reprobate নীতির কথাও উল্লেখ করেন আদালত।

আদালতের মতে, রিটকারীর এ ধরনের পরিবর্তনশীল ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য তাঁর দাবির আইনগত ভিত্তিকে দুর্বল করেছে। তিনি বিতর্কিত জমির বিষয়ে কোনো প্রত্যক্ষ ও বলবৎযোগ্য আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

রিট আবেদন খারিজ

সবশেষে হাইকোর্ট সিদ্ধান্ত দেন, রিটকারীর বিতর্কিত জমির ওপর কোনো প্রত্যক্ষ ও আইনস্বীকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় তাঁর রিট আবেদন দায়েরের আইনগত যোগ্যতা বা লোকাস স্ট্যান্ডি নেই। ফলে মামলার মূল বিরোধের গুণাগুণ বা বিকল্প প্লট বরাদ্দের বৈধতা নিয়ে বিস্তারিত সিদ্ধান্ত দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

এ কারণে আদালত রুল খারিজ করেন এবং রুল জারির সময় দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ প্রত্যাহার ও বাতিল করেন। তবে কোনো খরচ আরোপ করা হয়নি।

বিডি ল' পোস্ট/মাসুম


চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্যবোঝাই ট্রাক আটকে রাখলে স্টোর রেন্ট নয়, ডিটেনশন চার্জ আদায়ের নির্দেশ হাইকোর্টের: পূর্নাঙ্গ রায় প্রকাশ

চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্যবোঝাই ট্রাক আটকে রাখলে স্টোর রেন্ট নয়, ডিটেনশন চার্জ আদায়ের নির্দেশ হাইকোর্টের: পূর্নাঙ্গ রায় প্রকাশ

ছবি: সংগৃহীত 
চট্টগ্রাম বন্দরে শুল্কসংক্রান্ত জটিলতার কারণে পণ্যবোঝাই ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যান আটকে রাখা হলে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকের কাছ থেকে স্টোর রেন্টের পরিবর্তে ডিটেনশন চার্জ আদায় করতে হবে বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, এ ধরনের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমসংক্রান্ত প্রবিধানমালার ১৩৩ নম্বর প্রবিধান অধিকতর প্রযোজ্য। একই সঙ্গে আইনগতভাবে দুটি বিধানের মধ্যে কোনোটি অধিকতর সুবিধাজনক হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সেই সুবিধাজনক বিধান বেছে নেওয়ার অধিকার রাখেন।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি সর্দার মো. রাশেদ জাহাঙ্গীর ও বিচারপতি কাজী ওয়ালিউল ইসলাম-এর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ২২ জুলাই ২০২৬ তারিখে এ রায় দেন। তাহমিদ এন্টারপ্রাইজ বনাম বাংলাদেশ ও অন্যান্য (রিট পিটিশন নং ১৮৮১২/২০২৫) মামলায় আদালত এ সিদ্ধান্ত দেন। রায়ের পূর্নাঙ্গ অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে।

মামলার পটভূমি

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, তাহমিদ এন্টারপ্রাইজ চীন থেকে লেমিনেটেড উড প্যানেল আমদানি করে। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে আমদানিকারক শুল্ক ও কর পরিশোধের পর পণ্য খালাসের অনুমতি পায়। পরবর্তী সময়ে পণ্যগুলো ছয়টি ভাড়া করা কাভার্ড ভ্যানে তোলা হলে শুল্ক কর্তৃপক্ষ এইচএস কোডসংক্রান্ত ভুল ঘোষণার অভিযোগে বন্দর গেট থেকে ভ্যানগুলো আটকে দেয়।

পরবর্তীতে হাইকোর্টের নির্দেশনার আলোকে পণ্য পুনর্মূল্যায়ন করা হয় এবং অতিরিক্ত শুল্ক, কর ও অন্যান্য চার্জের বিপরীতে ব্যাংক গ্যারান্টি গ্রহণের মাধ্যমে পণ্য ছাড়ের অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু পণ্যবোঝাই ছয়টি কাভার্ড ভ্যান বন্দর থেকে বের করার সময় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ স্টোর রেন্ট বাবদ ৬৫ লাখ ২৭ হাজার ৩০৮ টাকা ২৩ পয়সা দাবি করে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের এ দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে আমদানিকারক হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন।

পক্ষগুলোর বক্তব্য

রিট আবেদনকারীর পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়, পণ্যগুলো কাভার্ড ভ্যানে তোলার পর শুল্ক কর্তৃপক্ষ সেগুলো আটকে রাখে এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের হেফাজতে রাখা হয়। ফলে এ ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমসংক্রান্ত প্রবিধানমালা, ২০০১-এর ১৩৩ নম্বর প্রবিধান অনুযায়ী ডিটেনশন চার্জ আদায় করা যেতে পারে। কিন্তু ১৬১ নম্বর প্রবিধান অনুযায়ী স্টোর রেন্ট আদায়ের সুযোগ নেই।

অন্যদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষে বলা হয়, পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও সেগুলো জেটি এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়নি। বরং চার মাসেরও বেশি সময় ধরে ছয়টি কাভার্ড ভ্যান বন্দরের নির্ধারিত স্থান দখল করে রেখেছিল। ফলে ২০০১ সালের প্রবিধানমালার ১৬১ নম্বর প্রবিধান অনুযায়ী স্টোর রেন্ট আদায় আইনসংগত।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্ট ২০০১ সালের প্রবিধানমালার ১৩৩ ও ১৬১ নম্বর প্রবিধান পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করেন।

প্রবিধান ১৬১ অনুযায়ী, কোনো পণ্য বা কনটেইনারের ডেলিভারি গ্রহণের পরও তা জেটি এলাকা থেকে সরিয়ে না নেওয়া হলে প্রচলিত নিয়মে ভাড়া বা স্টোর রেন্ট প্রযোজ্য হবে।

অন্যদিকে প্রবিধান ১৩৩ অনুযায়ী, আমদানি বা রপ্তানির পণ্যসহ কোনো ট্রাক বা পরিবহন জেটি এলাকায় আটকে থাকলে প্রতিটি পরিবহনের জন্য দৈনিক বা রাতপ্রতি নির্ধারিত হারে ডিটেনশন চার্জ আরোপ করা যাবে।

আদালত বলেন, প্রবিধান ১৩৩-এর প্রথম অংশে পণ্যবোঝাই ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যান আটকে থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। আর দ্বিতীয় অংশে মালিক, ভাড়াটিয়া বা চালকের অবহেলার কারণে খালি গাড়ি বন্দরের জেটি এলাকায় ফেলে রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে। দুটি অংশের প্রয়োগক্ষেত্র পৃথক এবং একটির সঙ্গে অন্যটির কোনো অপরিহার্য সম্পর্ক নেই।

আদালত আরও বলেন, আলোচ্য মামলায় পণ্যগুলো কাভার্ড ভ্যানে তোলার পর সেগুলো আটকে রাখা হয়েছিল। ফলে এ ক্ষেত্রে প্রবিধান ১৩৩-এর প্রথম অংশ অধিকতর উপযুক্ত ও প্রযোজ্য।

আদালতের সিদ্ধান্ত

হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ করেন, কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে আইনের দুটি পৃথক বিধান কমবেশি প্রযোজ্য হলে তিনি অধিকতর সুবিধাজনক বিধানটি বেছে নেওয়ার অধিকার রাখেন। আলোচ্য মামলায় প্রবিধান ১৩৩ ও ১৬১ উভয়টির প্রয়োগের সুযোগ থাকলেও পণ্যবোঝাই কাভার্ড ভ্যান আটকে রাখার পরিস্থিতিতে প্রবিধান ১৩৩ অধিকতর উপযুক্ত।

এ কারণে আদালত আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে ২০০১ সালের প্রবিধানমালার ১৩৩ নম্বর প্রবিধান এবং সংশ্লিষ্ট ট্যারিফ শিডিউল অনুযায়ী চার্জ নির্ধারণের অধিকারী ঘোষণা করেন।

আদালত রিটের রুল যথাযথ ঘোষণা করে (Rule made absolute) মামলাটি নিষ্পত্তি করেন এবং রায়ের অনুলিপি অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

আইনি শিক্ষা

এ রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্ট স্পষ্ট করেছেন, বন্দরে পণ্যবোঝাই ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যান আটকে রাখার ক্ষেত্রে স্টোর রেন্ট ও ডিটেনশন চার্জের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। পণ্য খালাসের উদ্দেশ্যে পরিবহনে তোলার পর তা আটকে রাখা হলে সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রবিধান ১৩৩ অনুযায়ী ডিটেনশন চার্জ প্রযোজ্য হতে পারে। পাশাপাশি, একই পরিস্থিতিতে একাধিক আইনগত বিধান প্রযোজ্য হলে অধিকতর সুবিধাজনক বিধান বেছে নেওয়ার অধিকারও স্বীকৃত হয়েছে।

মামলা: তাহমিদ এন্টারপ্রাইজ বনাম বাংলাদেশ ও অন্যান্য | রিট পিটিশন নং ১৮৮১২/২০২৫ | রায়ের তারিখ: ২২ জুলাই ২০২৬

বিডি ল' পোস্ট/মাসুম

৩১ অক্টো, ২০২৬

সাক্ষীদের জেরা করার সুযোগ না দিয়ে চাকরিচ্যুতি বেআইনি, এতে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়: হাইকোর্ট

সাক্ষীদের জেরা করার সুযোগ না দিয়ে চাকরিচ্যুতি বেআইনি, এতে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়: হাইকোর্ট

ছবি: সংগৃহীত 
বিভাগীয় তদন্তে সাক্ষীদের জেরা করার সুযোগ না দেওয়া এবং অভিযোগ উত্থাপনকারী কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতির পরিপন্থী বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। এসব প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কারণে চাকরি থেকে অপসারণের আদেশ বেআইনি ঘোষণা করে একজন প্রকৌশলীকে চাকরিতে পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

একই সঙ্গে আদালত পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, সরকারি মালিকানাধীন বা সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন কোনো কোম্পানি কোম্পানি আইনের অধীনে নিবন্ধিত হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারিক পর্যালোচনার এখতিয়ারের বাইরে চলে যায় না। কোনো প্রতিষ্ঠান জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনা করলে এবং তার সিদ্ধান্তে জনআইনের উপাদান বিদ্যমান থাকলে সেই সিদ্ধান্ত বিচারিক পর্যালোচনার আওতাভুক্ত হতে পারে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি উর্মী রহমান ও বিচারপতি শশাঙ্ক শেখর সরকারের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এ রায় দেন। মো. মাহবুব কবির বনাম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও অন্যান্য, রিট পিটিশন নং ১৩৫০১/২০২৫ মামলায় দেওয়া এ রায় সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ২৫ অক্টোবর ২০২৬।

মামলার পটভূমি

রিটকারী মো. মাহবুব কবির প্রথমে চুক্তিভিত্তিকভাবে বি-আর পাওয়ারজেন লিমিটেডে উপমহাব্যবস্থাপক (Deputy General Manager) হিসেবে নিয়োগ পান। পরবর্তীতে পদোন্নতি পেয়ে তিনি প্রধান প্রকৌশলী (Chief Engineer) হন এবং চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বিদ্যুৎকেন্দ্রে স্থাপিত জেনারেটরের উৎপত্তির দেশ নিয়ে বিরোধের জেরে তাঁর বিরুদ্ধে অবহেলা, অদক্ষতা ও অসদাচরণের অভিযোগ আনা হয়। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে বিভাগীয় তদন্ত পরিচালনা করা হয়। তদন্ত শেষে ২৩ জুন ২০২০ তারিখে তাঁকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়। পরবর্তীতে ৫ আগস্ট ২০২০ তারিখে তাঁর দায়ের করা আপিলও খারিজ করা হয়।

এরপর ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে তিনি চাকরিতে পুনর্বহালের আবেদন করেন। ১৩ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে বিদ্যুৎ বিভাগ (Power Division) কোম্পানিকে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার নির্দেশ দেয়। এ উদ্দেশ্যে গঠিত একটি কমিটি ১৩ মার্চ ২০২৫ তারিখে প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনে চাকরিচ্যুতির প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়। তবে পরবর্তী প্রতিবেদনে এসব অনিয়মের বিষয় উল্লেখ করা হয়নি। পরে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ তাঁকে পুনর্বহাল করা সম্ভব নয় বলে সিদ্ধান্ত নেয়।

এ অবস্থায় চাকরি থেকে অপসারণের আদেশ, আপিল খারিজের সিদ্ধান্ত এবং পুনর্বহালের আবেদন প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে তিনি হাইকোর্ট বিভাগে রিট দায়ের করেন।

হাইকোর্টের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ

১. সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানির বিরুদ্ধেও রিট করা যায়

আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, বি-আর পাওয়ারজেন লিমিটেডের অধিকাংশ শেয়ারের মালিকানা সরকারের এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাতে। প্রতিষ্ঠানটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনা করে।

তাই কোনো কোম্পানি কোম্পানি আইনের অধীনে নিবন্ধিত হলেও তার কার্যক্রম ও সিদ্ধান্তে জনআইনের উপাদান থাকলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে বিচারিক পর্যালোচনা সম্ভব।

বিশেষ করে, মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন, আইনগত কর্তৃত্বের অভাব, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতি লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত আদালতের পর্যালোচনার আওতায় আসতে পারে।

২. সাক্ষীদের জেরা করার সুযোগ না দেওয়া প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের লঙ্ঘন

আদালত দেখতে পান, তদন্ত কমিটি সাক্ষীদের কাছ থেকে লিখিত বক্তব্য গ্রহণ করলেও রিটকারীকে তাঁদের জেরা করার কোনো সুযোগ দেয়নি। বিশেষ করে, রিটকারী এবং তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুস সাবুরের বক্তব্যের মধ্যে পরস্পরবিরোধিতা ছিল।

এ অবস্থায় সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ না দেওয়ায় রিটকারীর আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে আদালত মনে করেন।

আদালত আরও উল্লেখ করেন, রিটকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপনকারী তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাঁর চাকরিচ্যুতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পরিচালনা পর্ষদের সভায়ও অংশগ্রহণ করেন। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা ও ন্যায্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দেয়।

আদালতের মতে, অভিযোগ উত্থাপনকারী ব্যক্তি নিজেই যদি সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশ নেন, তাহলে সেই প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

ফলে ত্রুটিপূর্ণ তদন্তের ভিত্তিতে দেওয়া চাকরি থেকে অপসারণের আদেশ আইনগতভাবে বহাল থাকতে পারে না।

৩. আপিল খারিজের সিদ্ধান্তও বেআইনি

বি-আর পাওয়ারজেন লিমিটেড এমপ্লয়িজ সার্ভিস রুলস, ২০১৬-এর বিধি ৭.১০(ই) অনুযায়ী, আপিল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ছিল শাস্তির ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপিত প্রমাণ যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না এবং আরোপিত শাস্তি যথাযথ, অপর্যাপ্ত নাকি অতিরিক্ত—তা পর্যালোচনা করা।

কিন্তু আদালত দেখতে পান, আপিল কর্তৃপক্ষ রিটকারীর উত্থাপিত নির্দিষ্ট অভিযোগ ও যুক্তিগুলো যথাযথভাবে বিবেচনা না করেই আপিল খারিজ করে। বরং তদন্তের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে—এমন বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়।

তাই আপিল খারিজের আদেশকেও বেআইনি ঘোষণা করেন আদালত।

৪. কয়েক বছর অতিবাহিত হওয়ায় রিট মামলা অগ্রহণযোগ্য হয় না

চাকরি থেকে অপসারণের পর উল্লেখযোগ্য সময় অতিবাহিত হওয়া এবং রিটকারীর কিছু চাকরিসংশ্লিষ্ট আর্থিক সুবিধা গ্রহণের বিষয়টি আদালতের নজরে আসে।

তবে আদালত বলেন, বিদ্যুৎ বিভাগের নির্দেশে পরবর্তীতে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হয়েছিল। সেই পুনর্বিবেচনার পর ১০ আগস্ট ২০২৫ তারিখে নেওয়া সিদ্ধান্ত রিট দায়েরের জন্য নতুন ও তাৎক্ষণিক কারণের (Fresh Cause of Action) সৃষ্টি করে।

তাই কেবল বিলম্বের যুক্তিতে রিট আবেদন অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করা যায় না। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ বিবেচনা না করে বিলম্বের বিষয়টি আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা সমীচীন নয়।

৫. চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পুনর্বহালের পথে স্বয়ংক্রিয় বাধা নয়

আদালত পর্যবেক্ষণ করেন, কোম্পানির চাকরি বিধিমালায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিধান থাকলেও নিয়োগের চুক্তিভিত্তিক প্রকৃতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনর্বহালের সম্ভাবনা নাকচ করে না।

সার্ভিস রুলসের বিধি ৭.৪(বি)-তে চাকরি থেকে অপসারণ (Removal) ও চাকরিচ্যুতি (Dismissal)-এর মধ্যে পার্থক্য করা হয়েছে। অন্যদিকে, বিধি ৭.১১-তে চাকরিতে পুনর্বহালের বিধান রয়েছে।

রিটকারীর চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তাঁকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়েছিল। যেহেতু আদালত অপসারণের আদেশকে বেআইনি বলে ঘোষণা করেছেন, তাই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ কিংবা পরবর্তীতে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়াকে পুনর্বহালের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বাধা হিসেবে গ্রহণ করেননি।

আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

উপরোক্ত পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে হাইকোর্ট বিভাগ রুল অ্যাবসলিউট (Rule Absolute) ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে আদালত নিম্নোক্ত আদেশ ও সিদ্ধান্তগুলো বাতিল করেন—

১. ২৩ জুন ২০২০ তারিখে জারি করা চাকরি থেকে অপসারণের আদেশ;

২. ৫ আগস্ট ২০২০ তারিখে রিটকারীর আপিল খারিজের আদেশ; এবং

৩. ১০ আগস্ট ২০২৫ তারিখে তাঁকে চাকরিতে পুনর্বহাল না করার সিদ্ধান্ত।

আদালত সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের রিটকারীকে চাকরিতে পুনর্বহালের নির্দেশ দেন। মামলায় কোনো খরচের আদেশ দেওয়া হয়নি।

রায়ের আইনগত গুরুত্ব

এই রায়ে বিভাগীয় তদন্তে অভিযুক্ত কর্মচারীর আত্মপক্ষ সমর্থনের কার্যকর সুযোগ নিশ্চিত করার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত হয়েছে। বিশেষ করে, আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সাক্ষীদের জেরা করার সুযোগ না দেওয়া প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতির লঙ্ঘন।

একই সঙ্গে অভিযোগ উত্থাপনকারী ব্যক্তি যদি অভিযোগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশ নেন, তাহলে সিদ্ধান্তের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

রায়ে আরও স্পষ্ট করা হয়েছে, আপিল কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ ও প্রমাণ স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করে যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত দিতে হবে। সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানির সিদ্ধান্তেও জনআইনের উপাদান থাকলে তা সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে বিচারিক পর্যালোচনার আওতাভুক্ত হতে পারে।

সর্বোপরি, কোনো কর্মচারীর নিয়োগ চুক্তিভিত্তিক হলেই তাঁর বেআইনি অপসারণের বিরুদ্ধে পুনর্বহালের প্রতিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায় না।

বিডি ল' পোস্ট/মাসুম


শুধু নথিপত্র যাচাইয়ের জন্য পুরোনো কর নির্ধারণ (Tax Assessment) পুনরায় খোলার সুযোগ নেই: হাইকোর্ট

শুধু নথিপত্র যাচাইয়ের জন্য পুরোনো কর নির্ধারণ (Tax Assessment) পুনরায় খোলার সুযোগ নেই: হাইকোর্ট

ছবি: সংগৃহীত 
জাহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পক্ষে দায়ের করা রিটে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২১২ ধারায় কোনো করদাতার সম্পন্ন ও চূড়ান্ত কর নির্ধারণ কেবল আয় বা সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের উৎস যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে পুনরায় খোলার ক্ষমতা কর কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি সর্দার মো. রাশেদ জাহাঙ্গীর ও বিচারপতি কাজী ওয়ালিউল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ২১ জুলাই ২০২৬ তারিখে রিট পিটিশন নং ৬২৪৯/২০২৫-এর রায় দেন। মামলাটি ছিল জাহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল বনাম জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও অন্যান্য। রায়ের পূর্নাঙ্গ অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে।

মামলার পটভূমি

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ১২ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে জাহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালকে আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২১২ ধারায় কয়েকটি নোটিশ প্রদান করে। এসব নোটিশে ২০১৬-২০১৭, ২০১৭-২০১৮, ২০১৮-২০১৯ এবং ২০২০-২০২১ করবর্ষের সম্পন্ন কর নির্ধারণ পুনরায় খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছিল, প্রতিষ্ঠানের আয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন। এ উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠানটিকে আয়কর রিটার্ন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করতে বলা হয়।

এরপর ওই নোটিশগুলোর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্টে রিট দায়ের করে প্রতিষ্ঠানটি। রুল জারির সময় আদালত নোটিশগুলোর কার্যকারিতা স্থগিত করেন।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্ট আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২১২ ধারার বিধান পর্যালোচনা করে বলেন, কোনো নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে উপকর কমিশনারের বিশ্বাস করার যুক্তিসংগত কারণ থাকতে হবে যে, কোনো করদাতা সংশ্লিষ্ট করবর্ষে আইন অনুযায়ী প্রদেয় কর পরিশোধ এড়িয়ে গেছেন।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে সম্পন্ন কর নির্ধারণ পুনরায় খুলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

তবে আদালত স্পষ্ট করেন, সম্পন্ন কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু সংশ্লিষ্ট নথিপত্র বা আয়ের উৎস যাচাই করার উদ্দেশ্যে ২১২ ধারার অধীনে পুনরায় কর নির্ধারণ খোলার ক্ষমতা দেওয়া হয়নি।

আদালতের মতে, আলোচ্য মামলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অতীতের সম্পন্ন কর নির্ধারণ পুনরায় খোলার ক্ষেত্রে আইনের ২১২ ধারার অধীনে প্রদত্ত ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছে।

আদালতের আদেশ

এসব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে হাইকোর্ট রুল যথাযথ ঘোষণা করেন (Rule made absolute)।

একই সঙ্গে ১২ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে জারি করা আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২১২ ধারার অধীন নোটিশ এবং সংশ্লিষ্ট চিঠিগুলো ২০১৬-২০১৭, ২০১৭-২০১৮, ২০১৮-২০১৯ ও ২০২০-২০২১ করবর্ষের ক্ষেত্রে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও আইনগত কার্যকারিতাহীন ঘোষণা করেন।

আইনি শিক্ষা

এই রায় থেকে প্রতীয়মান হয়, কর কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা আইন দ্বারা নির্ধারিত সীমার মধ্যে প্রয়োগ করতে হবে। কোনো করদাতার সম্পন্ন কর নির্ধারণ পুনরায় খোলার ক্ষেত্রে কেবল নথিপত্র যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা যথেষ্ট নয়; আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২১২ ধারায় নির্ধারিত আইনগত শর্ত পূরণ করতে হবে।

সূত্র: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ; Writ Petition No. 6249 of 2025, রায় ও আদেশের ৬ পৃষ্ঠার নথি।

বিডি ল' পোস্ট/মাসুম

৩০ অক্টো, ২০২৬

নিবন্ধিত দলিলে জালিয়াতির অভিযোগ থাকলেই অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা নয়: হাইকোর্ট

নিবন্ধিত দলিলে জালিয়াতির অভিযোগ থাকলেই অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা নয়: হাইকোর্ট

দলিলে জমির পরিমাণ নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগে করা মামলায় অধস্তন আদালতের আদেশ বহাল রাখলেন হাইকোর্ট। প্রাসঙ্গিক আইন: দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮-এর আদেশ ৩৯, বিধি ১
নিবন্ধিত কবলা দলিলে জমির পরিমাণ জালিয়াতির মাধ্যমে বাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চেয়ে করা আবেদন খারিজের আদেশ বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, জমির নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার মতো অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দিতে হলে আবেদনকারীকে প্রাথমিকভাবে একটি গ্রহণযোগ্য, যুক্তিসংগত ও মামলায় জয়ের সম্ভাবনাসম্পন্ন দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

মামলার তথ্য ও পটভূমি:

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি এস. এম. কুদ্দুস জামান ও বিচারপতি তামান্না রহমান খালিদীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ফার্স্ট মিসলেনিয়াস আপিল নং ১৩০/২০২৬ এবং সংশ্লিষ্ট সিভিল রুল নং ২১৩ (এফএম)/২০২৬-এর শুনানি শেষে ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে রায় দেন। মো. হানিফ আলী বনাম মো. সিরাজুল ইসলাম ও অন্যান্য মামলাটিতে ঢাকার চতুর্থ যুগ্ম জেলা জজ আদালত টাইটেল স্যুট নং ৪৩১/২০২৫-এ অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন খারিজ করে ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে যে আদেশ দিয়েছিলেন, তার বিরুদ্ধে বাদী আপিল করেন। হাইকোর্ট আপিল খারিজ করে নিম্ন আদালতের আদেশ বহাল রাখেন এবং সংশ্লিষ্ট সিভিল রুলটি নিষ্পত্তি করেন। একই সঙ্গে রুল জারির সময় দেওয়া স্থিতাবস্থার আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। রায়টির পূর্নাঙ্গ অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে।

বাদীপক্ষের যুক্তি:

বাদী দাবি করেছিলেন, তিনি ও তাঁর দুই ভাই মিলে ১ দশমিক ৪৪ একর জমির মালিক ছিলেন। এর মধ্যে তিনি বিবাদীকে ৫২ শতাংশ জমি হস্তান্তর করলেও নিবন্ধিত দলিলে জালিয়াতির মাধ্যমে জমির পরিমাণ বাড়িয়ে ১ দশমিক ৪৪ একর দেখানো হয়েছে। অবশিষ্ট ৯২ শতাংশ জমির স্বত্ব ঘোষণার পাশাপাশি জমিতে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার আবেদন করেছিলেন তিনি।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

তবে হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ দেন, বাদী নিজেই স্বীকার করেছেন যে জমিটি তাঁর ও দুই ভাইয়ের যৌথ মালিকানাধীন ছিল এবং তাঁরা নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে জমি হস্তান্তর করেছেন। সে ক্ষেত্রে বাদী কীভাবে এককভাবে অবশিষ্ট ৯২ শতাংশ জমির স্বত্ব দাবি করছেন, তা স্পষ্ট নয়। আদালত আরও উল্লেখ করেন, দলিলে জমির পরিমাণ জালিয়াতির মাধ্যমে পরিবর্তন করা হয়ে থাকলে দলিল সংশোধনের মামলা না করে শুধু স্বত্ব ঘোষণার মামলা দায়ের করার বিষয়টিও বিবেচ্য।

আদালত বলেন, বাদী স্বীকার করেছেন যে বিবাদী ক্রয়সূত্রে জমির দখলে রয়েছেন এবং সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন। সাধারণভাবে কোনো জমিতে ভবন বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের ফলে জমির মূল্য বৃদ্ধি পায়। তাই নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ক্ষেত্রে আবেদনকারীর শক্তিশালী প্রাথমিক মামলা থাকা জরুরি। কিন্তু বাদী তাঁর দাবির পক্ষে এমন গ্রহণযোগ্য ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি।

ফলে আদালত মনে করেন, অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন খারিজ করে নিম্ন আদালত সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এতে হস্তক্ষেপের কোনো কারণ নেই।

হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

হাইকোর্ট ফার্স্ট মিসলেনিয়াস আপিলটি খারিজ করেন এবং সংশ্লিষ্ট সিভিল রুলটি নিষ্পত্তি করে দেন। রুল জারির সময় দেওয়া স্থিতাবস্থার আদেশও প্রত্যাহার করা হয়। তবে মামলায় কোনো খরচ আরোপ করা হয়নি।

আইনি তাৎপর্য:

জমির দলিলে জালিয়াতির অভিযোগ থাকলেই অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যায় না। দাবিকৃত স্বত্ব, দখলের অবস্থা, মামলার ধরন এবং প্রয়োজনীয় প্রতিকার চাওয়ার যথার্থতা আদালতের বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ। জমির দলিলে জালিয়াতির অভিযোগ থাকলেই অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যায় না।

বিডি ল' পোস্ট/মাসুম